Tuesday, June 14, 2011

‘ছড়ানো মুক্তো’


ভগবানই হচ্ছেন সবচেয়ে আপনজন। তাঁর চেয়ে আপন আর কেউ নেই। যারা ভগবানকে ভালবাসে, তারাই ঠিক ঠিক মানুষকে ভালবাসে। যারা ভগবানকে ভালবাসে না, তারা মানুষকেও ঠিক ঠিক ভালবাসতে পারে না।

কৃপা করা না করা তাঁর ইচ্ছা। সেক্ষেত্রে ঠাকুরের কাছে এই বলে order বা হুকুম করা চলবে না – আমি এত করেছি তাই দিতে হবে। প্রার্থনা আর order এক নয়। কৃপার রাজ্যের কথা আলাদা। ঠাকুর যে কখন কাকে কীভাবে কৃপা করবেন, তা কেউ বলতে পারে না।

ভালবাসতে গেলে আঘাত পেতেই হবে। ভগবানের ভালবাসা নিঃস্বার্থ ভালবাসা। ভগবান যখন মানুষরূপে আসেন, তাঁকে আঘাত পেতে হয়। অবতার আসেন ভালবাসার চরম আদর্শ দেখাতে।

অন্তরে ক্ষোভ বা বাসনা পুষে রাখলে কখনও সার্থক মানুষ হওয়া যায় না। মনকে সব সময় শান্ত রাখতে হবে। লক্ষ্য রাখবে যাতে কোনও বাসনা ঢুকে মনকে অশান্ত করতে না পারে।

সন্ন্যাসী যে হবে তাকে করতে হবে সব কিছুর সম্যক্‌ ন্যাস। যার অন্তরের বাসনার সম্যক্‌ ন্যাস হয়েছে সেই সার্থক সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীর কোনও ক্ষোভ থাকবে না।

তীব্র বৈরাগ্য না নিয়ে এলে আশ্রমে কেউ ঠিক ঠিকভাবে থাকতে পারে না। আশ্রমে থাকতে গেলে চাই তীব্র বৈরাগ্য।

একমাত্র আধ্যাত্মিক পথই মানুষকে শািন্ত দিতে পারে।

যার যেমন সামর্থ্য তার তেমনই চলা উচিত। অন্যের অনুকরণ করে নিজের সামর্থ্যের বাইরে কখনোই চলা উচিত নয়। এতে গৃহে অশািন্তর সৃিষ্ট হয়, মনে বাসনা জেগে ওঠে, তীব্রক্ষোভের সৃিষ্ট হয়। যে যার নিজের পথে ঠিক মত চললেই সংসারে শািন্ত অাসবে। মনে কোনও বাসনার সৃিষ্ট হলেই তাকে দূর করার চেষ্টা করতে হবে। এজন্য তীব্র প্রার্থনা করতে হয়।

সত্য পথে চলাটা জীবনের উদ্দেশ্য ঠিকই। সত্য পথকে ভিত্তি করেই জীবনে চলতে হবে, কিন্তু শুধু সেটাই সব নয়, এর সাথে ভগবৎবিশ্বাস, ভক্তি, ভগবৎশরণ, ঠাকুরের প্রতি ভালবাসা এবং নিষ্ঠাকেও যুক্ত করতে হবে। এইভাবেই জীবনের চলা সহজ হয়ে যাবে। আমার জীবনের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হবে ঈশ্বরকে লাভ করা। ঈশ্বরকে লাভ করলেই জীবনের সব চলা সার্থক হবে।

শ্রীঅর্চনাপুরীর ‘ছড়ানো মুক্তো’ থেকে

Sunday, June 5, 2011

‘মায়ের আশীর্বাদ’


বিনীত হওয়ার অর্থ মন প্রাণ দেহ কখনও ভুলবে না যে ভগবান ছাড়া তারা কিছুই জানে না, তারা কিছু করতেই পারে না–ভগবান ছাড়া তারা হল কেবল অজ্ঞান। একমাত্র ভগবানই সত্য, জীবন, শক্তি, প্রেম, অানন্দ।

কাজেই মনের প্রাণের দেহের এই জ্ঞান এই বোধ হওয়া চাই যে ভগবানকে বুঝবার বিচার করবার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা তাদের নেই, শুধু ভগবানের স্বরূপ নয়, তাঁর কর্ম, তাঁর প্রকাশও নয়।

এই হচ্ছে একমাত্র সত্যিকার বিনয়, এটা থাকলেই মেলে স্থিরতা, শািন্ত। এই হচ্ছে সকল অশািন্তর আক্রমণের বিরুদ্ধে একমাত্র নিরাপদ ধর্ম। সত্যি কথা বলতে কি, মানুষের মধ্যে অপশক্তি এসে যে দরজায় করাঘাত করে তা হল অহংকার, এই দরজার ভেতর দিয়েই সে আসে।

কেবলমাত্র আপন জীবনযাত্রার পরিবর্তন দ্বারা তুমি আশা করতে পার সত্যিকার স্বাস্থ্য

কোনো মানুষী ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত ভগবানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে টিকবে না। এস, আমরা সম্পূর্ণভাবে কেবলমাত্র ভগবানের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াই, শেষ পর্যন্ত বিজয় সুনিিশ্চত।

সময়ের কথা না ভেবে, স্থানিক ভয় না করে, আমরা এগিয়ে চলব অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়ে পবিত্র হয়ে–না থেমে কেবল আমরা উড়ে চলব সিদ্ধির লক্ষ্যের অভিমুখে–অতিমানসের বিজয়ের দিকে।

অন্যকে ‘‘সাহায্য’’ করবার বাসনা যেন তোমাকে পেয়ে না বসে–তোমার আন্তরিস্থতি থেকে তুমি নিজে ঠিক মতো কাজ করে চল, ঠিকমতো চল আর অপরকে সাহায্য করার ব্যাপারটা ভগবানের ওপর ছেড়ে দাও। সত্যি সত্যিই কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারে না–একমাত্র ভগবানের করুণা ছাড়া। আগে ভেতরটা, বাইরেটা পরে। তা নইলে আমাদের আন্তরশক্তি ও জ্ঞানের সীমা ছাড়িয়ে যদি কিছু করতে যাই তা ব্যর্থ হবে, ভেঙে পড়বেই।

শিশু তার আপন বিকাশের জন্য মোটেই চিন্তা করে না, সে আপনা থেকেই সহজে বেড়ে ওঠে।

চল ঋজু হয়ে দৃঢ়ভাবে লক্ষ্য সম্বন্ধে সচেতন হয়ে, নিজে তোমার জীবনের প্রভু হয়ে।

পূর্ণ সিদ্ধির পথে যে মানুষ এগিয়ে যেতে চায়, সে কখনো জীবনের বাধাবিেঘ্নর জন্য প্রতিবাদ করবে না–প্রতিটি বাধাই হল আরও একপা এগিয়ে যাবার সুযোগ–প্রতিবাদ মানেই হল দুর্বলতা ও কপটতার লক্ষণ।

‘ভগবান’–বলতে আমরা এই বুঝি... যাকিছু জ্ঞান আমাদের অর্জন করতে হবে, যাকিছু শক্তি আমাদের লাভ করতে হবে, যাকিছু ভালোবাসার পাত্র আমাদের হয়ে উঠতে হবে, যাকিছু পরিপূর্ণতা আমাদের পেতে হবে, জ্যোতি আর আনন্দকে অবলম্বন করে যাকিছু সুসঙ্গতিময় ও প্রগতিমূলক তা জীবন মাঝে প্রকাশ করতে হবে, যাকিছু অজ্ঞাত এবং অভিনব আলো রয়েছে তাদের উপলিব্ধ করতে হবে।

কানুপ্রিয়  চট্ট্যপাধ্যায়  সংকলিত ‘মায়ের আশীর্বাদ’ থেকে